তবে এজন্য কোম্পানিগুলোর অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার আইপিওর বা ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে হস্তান্তরের শর্ত পূরণ করতে হবে। অন্যথায় ওই কোম্পানিকে তালিকা-বহির্ভূত কোম্পানির সমান হারে কর পরিশোধ করতে হবে, যার হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যদি বার্ষিক সব আয় ও লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করে, তবে তাদের করহার আরো কমে ২০ শতাংশ হবে। আর যেসব তালিকাভুক্ত কোম্পানি ১০ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের শর্ত পূরণ করেনি, সেগুলো যদি সব আয় ও লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করে, তবে তাদের করহার হবে ২৫ শতাংশ। অর্থ আইন ২০২৬-এর খসড়ায় এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
অর্থবিলে একই সঙ্গে কর প্রশাসনের ক্ষমতা বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন খাতকে কর আইনের আওতায় আনা, বিকল্প নিকোটিন পণ্যে উচ্চহারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ এবং আমদানি পর্যায়ে বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাবের সঙ্গে অর্থবিল উত্থাপন করবেন। সংসদে পাস হলে আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বিধান কার্যকর হবে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রস্তাবিত বিধানগুলোয় পরিবর্তন আসতে পারে।
ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও পৃথক করহার কাঠামো বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং তালিকা-বহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের জন্য ৪০ শতাংশ রাখা হয়েছে। তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ৪৫ শতাংশ করহার বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। একই হার প্রযোজ্য হতে পারে মোবাইল ফোন অপারেটরদের ক্ষেত্রেও। তবে নির্দিষ্ট শর্তে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে মোবাইল অপারেটরদের করহার ৪০ শতাংশে নেমে আসবে।
কর প্রশাসন শক্তিশালী করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটকে আরো বিস্তৃত ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কর ফাঁকির অভিযোগ অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ, তল্লাশি, জব্দ এবং তদন্ত পরিচালনার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধের উপাদান পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলা দায়েরের বিধানও স্পষ্ট করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ, সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেন-সংক্রান্ত তথ্য বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনার বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে টার্নওভারভিত্তিক কর ব্যবস্থা, অগ্রিম কর ও চূড়ান্ত করের সংজ্ঞা ও প্রয়োগ পদ্ধতি পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব রয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতিকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে প্রথমবারের মতো ‘ফ্রিল্যান্সিং’ ও ‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন’কে আইনি সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ-সংক্রান্ত কয়েকটি নতুন সংজ্ঞাও যুক্ত করা হয়েছে।
করদাতাদের সময়মতো রিটার্ন দাখিলে উৎসাহ দিতে নতুন প্রণোদনার প্রস্তাব রয়েছে। আয়বর্ষ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে নির্ধারিত করের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে করদাতাকে কোনো অতিরিক্ত কর দিতে হবে না, তবে তারা কোনো প্রণোদনাও পাবেন না। কিন্তু ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে বিলম্বে রিটার্ন দাখিল করলে প্রদেয় করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত কর হিসেবে পরিশোধ করতে হবে। আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ বেড়ে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা (যেটি বেশি) নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ছাত্র হিসাব, নো-ফ্রিলস হিসাব এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অব্যাহতিপ্রাপ্ত কিছু হিসাব ছাড়া নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার বিধান আরো স্পষ্ট করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের বিদ্যমান কর সুবিধাও অব্যাহত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। নারী ও প্রতিবন্ধী মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্নওভার ৭০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত কর অব্যাহতির সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। তবে এ সুবিধা পেতে এসএমই ফাউন্ডেশনে নিবন্ধিত হওয়ার শর্ত থাকবে।
অর্থবিলে খাদ্যদ্রব্য, পানীয়, তামাকজাত পণ্য, বিলাসপণ্য, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের আমদানি এবং সরবরাহ পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মাংস, মাছ, দুগ্ধজাত পণ্য, ফল, সবজি ও মসলা জাতীয় বিভিন্ন পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। বিভিন্ন অ্যালকোহলজাতীয় পানীয়র ক্ষেত্রে এ হার ২৫০-৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ক্ষেত্রে নতুন শুল্ক কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। নিকোটিন পাউচ ও নিকোটিন গ্রানিউলসের ওপর ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পর্যায়ে নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
শিল্প ও ভোগ্যপণ্যের মধ্যে পোর্টল্যান্ড সিমেন্টে ২০ শতাংশ, পেইন্ট ও সংশ্লিষ্ট পণ্যে ৩০ শতাংশ, প্রসাধনীতে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ এবং চুলের প্রসাধনী ও সাবানে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। টিস্যু পেপার, টয়লেট পেপার, মোটরযানের টায়ার, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, রঙিন টেলিভিশন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বিভিন্ন উপাদানের ওপরও নতুন শুল্কহার নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
অটোমোবাইল খাতে ইঞ্জিন সক্ষমতা ভেদে ২০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রেও সক্ষমতা অনুযায়ী, ১০ থেকে ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর সম্পূরক শুল্ক শূন্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
রফতানি ও বিনিয়োগ কার্যক্রম সহজ করতে অর্থবিলে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলসংক্রান্ত নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশের যেকোনো এলাকাকে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে। এসব অঞ্চলে আমদানি, রফতানি, সংরক্ষণ, দেশীয় বাজারে বিক্রি ও শুল্ক ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে রফতানির সংজ্ঞা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্রের আওতায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল সরবরাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক স্থানীয় ঋণপত্রের আওতায় রফতানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহকে রফতানি কার্যক্রম হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত অর্থবিলের খসড়ায় কর প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, করদাতার পরিধি সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা এবং বিনিয়োগ ও রফতানিসংশ্লিষ্ট বিধান আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।